শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান

অবশেষে দেশের সাড়ে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে দেড়টি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের ছিল না কোনো যোগাযোগ। এ অবস্থায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দম যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অভিভাবকরাও ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন তাদের সন্তানদের নিয়ে।

বর্তমানে করোনা মহামারির প্রকোপ কমতে থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। স্কুল খোলার ঘোষণা শোনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। অভিভাবকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। নড়েচড়ে বসেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা। জোরেশোরে চলছে প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।

দীর্ঘ বিরতির পর দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও খোলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যদিও করোনা সংক্রমণের ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তারপরও সবার মুখে সুখের হাসি! আবার সবাই বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারবে, খেলাধুলা করতে পারবে। তবে যদি করোনা সংক্রমণের ভয়টা পুরোপুরি কেটে যেত, তাহলে সত্যিই এটা হতে পারত শতভাগ সুখের একটি সংবাদ। কিন্তু তা হচ্ছে না।

সবাই দলবেঁধে স্কুলে যাবে, একসঙ্গে মেলামেশা করবে- এতে নতুন করে সংক্রমণের একটা আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। একবার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু যে কোনো কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে গেছে। পড়ালেখার দীর্ঘ বিরতিতে অনেকেই বিপথে চলে গেছে। অনলাইনে ক্লাস করার অজুহাতে মোবাইল-ল্যাপটপের অপব্যবহার বা কুফল অনেক শিক্ষার্থীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থেকে এবং মোবাইল-ল্যাপটপে মগ্ন থেকে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অনেকেই পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং লেখাপড়া বাদ দিয়ে উপার্জনের পথে নেমেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা নিলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই টেলিভিশন দেখার বা অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ ছিল না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- দীর্ঘ দেড় বছরে শিক্ষার্থীদের এই যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তা কি আদৌ পূরণ করা সম্ভব হবে? যেভাবেই হোক এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হবে। এজন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে।

এজন্য শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সরেজমিন মনিটর করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যসব কর্মচারীকে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে, ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হবে। সর্বোপরি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এক বেঞ্চে দুজন শিক্ষার্থীকে বসাতে হবে।

এতদিনে আমরা তো এটা বুঝে গেছি যে, যেহেতু নাক ও মুখ দিয়ে করোনাভাইরাস সহজেই শরীরে প্রবেশ করে, কাজেই মুখে মাস্ক পরাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে, বিশেষ করে সঠিকভাবে মাস্ক পরলে এবং ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করলে সংক্রমণের আশঙ্কা কম। অথচ এ ব্যাপারটা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। এটা আমাদের উদাসীনতা, আমাদের অবহেলা। এর প্রমাণ আমরা বহুবারই পেয়েছি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও আগের মতো প্রাণখুলে হয়তো সহজে আমরা মেলামেশা করতে পারব না, কিন্তু ভাঙতে তো পারব বন্দি জীবনের অসহনীয় যন্ত্রণা। দীর্ঘ দেড় বছর পর যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হচ্ছে, তা যেন আমাদের সামান্য অবহেলা ও অসতর্কতায় আবার বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আনন্দে আমরা যেন বিভোর হয়ে না পড়ি এবং ভুলে না যাই করোনা নামের শক্তিশালী ভয়াবহ দানবের কথা। আমরা প্রত্যাশা করি, একদিন সত্যিকারভাবেই চিরচেনা রূপে ফিরবে সব শিক্ষাঙ্গন। তখন সবাই সবার সঙ্গে আগের মতো মেলামেশা করতে পারবে।